মায়ের সামনে ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা, পুলিশ বলছে ‍‍`অপমৃত্যু‍‍`‍‍`

প্রকাশিত: ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০২০

ঢাকা : নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বাড়িওয়ালার ছেলে অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলে ছিলেন কাইয়ুম খান (৩৫)। এ নিয়ে স্ত্রীকে গালাগাল করলে সে তার পরকীয়া প্রেমিক অনিককে দিয়ে তাকে উচিৎ শিক্ষা দেবে বলে শাসিয়ে বাড়িওয়ালার রুমে চলে যায়। পরে বাড়িওয়ালা নাছিরের কাছে কাইয়ুম তার ছেলের বিষয়ে বিচার দিয়েছিল। কিন্তু বিচার মেলেনি, উল্টো নিজের ছেলে অনিকের দোষ ঢাকতে বাবা-ছেলেসহ কয়েকজন মিলে রুমের ভেতর কাইয়ুমকে আটকে লোহার রড দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে স্থানীয় পুলিশের খাতায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে। তবে কাইয়ুমের শরীরজুড়ে ছিল রক্ত জমাট নির্মম আঘাতের চিহ্ন।

গত ৩ আগস্ট রাজধানীর রামপুরা থানাধীন, পূর্ব রামপুরা ভূইয়া গলির নং-৪২ বাসায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বামে মুনসুর ও ডানে কাইয়ুমের মা রহিমা বেগম

নিজের চোখের সামনে একমাত্র সন্তানকে নির্দয়ভাবে পেটানোর সেই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখেছিলেন কাইয়ুমের মা রহিমা বেগম। এ সময় ছেলেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই আত্মচিৎকারে কেউ সাড়া দেয়নি। একপর্যায়ে ছেলের বউ শিরীন আক্তার জোর করে নিয়ে তাকে পাশের রুমে আটকে রাখে। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এক সময়  জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরে শুনেন হাসপাতালে কাইয়ুম মারা গেছে।

ছেলেকে পিটিয়ে হত্যার লোমহর্ষক সেই ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে রহিমা বেগম বলেন, সেদিন কাইয়ুম বাসায় ফিরে বউকে বাড়িওয়ালার ছেলের সঙ্গে অনৈতিক মেলামেশা  করতে দেখে। পরে বাড়িওয়াল নাছির বাহির থেকে এলে তার কাছে বিচার দেয় কাইয়ুম। এরপর বউ ঘরে এলে তাকে গালাগাল করলে সে আবারও অনিককে ডেকে নিয়ে আসে। এ সময় নাছির-অনিকসহ কয়েকজন মিলে ঘরে ঢুকে দরজা-জানালা বন্ধ করে কাইয়ুমকে লোহার রড ও কাঠের চেলি দিয়ে পেটাতে থাকে। তখন কাইয়ুম নাছিরের পায়ে ধরে বাঁচার আকুতি জানায় এবং কাউকে কিছু বলবে না বলে জানায়। নাছির তার কথা কান না দিয়ে বুকে লাথি মেরে কাইয়ুমকে ফেলে দেয়। তখন অনিকসহ কয়েকজন কাইয়ুমকে এলোপাতাড়ি পেটায়। একপর্যায়ে কাইয়ুম নিছতেজ হয়ে পড়ে।

মেডিকেল রিপোর্ট ও পুলিশের এজহার 

এ বিষয়ে কাইয়ুমের চাচাতো ভাই মুনসুর জানান, কাইয়ুম জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তার স্ত্রী শিরীন আক্তার আমাকে ফোন দিয়ে দ্রুত বাসায় আসতে বলে। তখন কাইয়ুমের কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় কাইয়ুম স্টোক করেছে। কিভাবে হয়েছে জানতে চাইলে সে জানায় কাইয়ুম পড়ে গিয়ে মাথায় ব্যথা পেয়েছে। তখন আমি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিতে যেতে বলি। পরে হাসপাতালে গিয়ে দেখি কাইয়ুমের পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন। এসময় মোবাইলে একাধিক ছবি তুলি। যেখানে কাইয়ুরের হাতে পায়ে পেটে এবং মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পরে চাচির কাছে শুনলাম রড দিয়ে কাইয়ুমকে পিটিয়েছে।

কাইয়ুমের মা রহিমা বেগম আরও বলেন, দেড় বছর আগে বাড়িওয়ালার গৃহপরিচারিকা ময়মনসিংহ গৌরিপুর থানাধীন বাংলাবাজার স্কুল সংলগ্ন রহমত আলীর মেয়ে শিরীন আক্তারের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয় কাইয়ুমের। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে গ্রামের বাড়ি থাকতেন কাইয়ুমের মা। গত কোরবানির ঈদের আগে মাকে বেড়াতে নিয়ে আসেন কাইয়ুম।

রহিমা বেগমের ভাষ্য মতে, কাইয়ুমের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতাল থেকে পুলিশ তার কাছে আসে। তখন ঘটনা বিস্তারিত পুলিশকে বলেছিলাম। এর পর দারোগা সাব তখন বলেছিলেন, আপনার ছেলে হত্যার বিচার হবে। মামলা করার কথা বললে তিনি তখন একটা কাগজে তার একটি টিপসই নেয়। এখন শুনছি, সেখানে পুলিশ লিখেছে, ছেলে এমনিতেই মারছে।

পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ৩ আগস্ট রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ির কেয়ারটেকার কাইয়ুম পানির মোটর দেখতে যায়। ফিরতে দেরি হওয়ায় তার স্ত্রী মোটরের কাছে গিয়ে দেখতে পায়, কাইয়ুম অচেতন হয়ে পড়ে আছে। আশপাশের লোকজন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে এজাহারে বাদীর কোনো অভিযোগই উল্লেখ করা হয়নি। এতে রহিমা বেগমের টিপসই রয়েছে।

কাইয়ুমের চাচাতো ভাই মুনসুর রহমান অভিযোগ করেন, এজাহারটি পড়ে একাধিকবার রামপুরা থানায় গিয়ে মামলা করতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।

মুনসুর কাইয়ুমের এক বন্ধুর বরাত দিয়ে আরো জানায়, কাইয়ুমের মোবাইলে তার স্ত্রী ও অনিকের কু-কর্মের একাধিক ছবি ও ভিডিও ছিল। সেই মোবাইল ঘটনার পর তার বউ নিয়ে সবকিছু মুছে ফেলেছে। পরে সেই মোবাইল কাইয়ুমের মাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।  শিরীন আক্তার এখনও ওই বাড়িতেই বসবাস করছে।

 

এসব বিষয়ে রামপুরা থানার ওসি আ. কুদ্দুস ফকির সোনালীনিউজকে জানান, কাইয়ুমের মৃত্যুর বিষয়টি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলেই বলতে পারবো। এ নিয়ে চিকিৎসকরা রিপোর্ট দেবেন। সে বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।