দেশে পাঠানো প্রবাসীদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য ৫ পরামর্শ

প্রকাশিত: ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২১

ঢাকা: বছরের পর বছর কাজ করে দেশে টাকা পাঠান বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা। কিন্তু দেশে ফিরে অনেকে দেখেন, সেই টাকার আর হিসাব দিতে পারছেন না স্বজনরা। এতে বিপাকে পড়েন তারা। এত বছর ধরে পাঠানো পরিশ্রমের টাকা এভাবে বেহাত হওয়া দেখে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরকমই ঘটনা ঘটে সৌদি প্রবাসী মো. নাসিরউদ্দিনের সঙ্গে।

১৭ বছর পর দেশে ফিরে তিনি দেখলেন, স্বজনদের কাছে এত বছর ধরে তিনি যে টাকা-পয়সা পাঠিয়েছিলেন, তা বেহাত হয়ে গেছে। দেশে ফিরে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার মতো টাকা-পয়সাও তার হাতে নেই। অবশেষে তাকে ঠাঁই নিতে হয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সেফ হোমে। তার পরিস্থিতির একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।

শুধু নাসিরউদ্দিন না, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনে এমন ঘটনা যেন নিয়মিতই ঘটে। বিদেশ থেকে আসা অর্থের বড় অংশটি আসে রেমিট্যান্স খাতে, অর্থাৎ প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে। এ আয়ের একটি বড় অংশ দেশে পাঠান বিদেশে কাজ করা অদক্ষ কর্মীরা। পুরো বছরে প্রবাসীরা ২ হাজার ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ কমবেশি ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু যে প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান, তাদের অনেকেই দেশে ফিরে স্বজনদের দ্বারা প্রতারণার শিকার হন। ওই অর্থ যাদের কাছে পাঠানো হয়, তারা নানা কারণে বা নানা অজুহাতে টাকা খরচ করে ফেলেন, আবার অনেক প্রবাসীর পাঠানো অর্থে গড়া সম্পদ শেষ পর্যন্ত অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরীফুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঠিক কত সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে পাঠানো টাকা নিয়ে প্রতারণার শিকার হন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা যারা প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করি, বিশেষ করে বিমানবন্দরে একটি জরুরি সেবা দিই, আমরা দেখেছি, প্রায়ই এই ধরনের ঘটনা ঘটে। যে মানুষদের জন্য তারা বিদেশে থেকে কষ্ট করে টাকা পাঠাচ্ছেন, তারা সেগুলো খরচ করে ফেলছে, তাদের গ্রহণ করতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছি, পুরুষদের চেয়ে নারীদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। যে নারী এত কষ্ট করে টাকা পাঠাচ্ছেন, তার স্বামী হয়তো আরেকটা বিয়ে করে ফেলছে, অথবা সেই আয় তার নিজের নামেই নেই।’

অন্যদিকে প্রবাসী পুরুষদের বিষয়ে শরীফুল হাসান বলেন, ‘এক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়, একজন প্রবাসী কর্মীর স্ত্রী হয়তো টাকা খরচ করে ফেলেছেন, অথবা তার বাবা-ভাই সম্পত্তি নিজেদের নামে নিবন্ধন করেছে।’

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন তাসনীম সিদ্দিকী জানান, ‘এমন অনেক হয়েছে যে, প্রবাসীর টাকায় হয়তো পরিবারের সম্পত্তি হয়েছে, কিন্তু প্রবাসীকে দেশে ফিরে এসে তা বাবা-ভাই-বোনদের সাথে ভাগ করে নিতে হচ্ছে। অথবা এমনও হয়েছে, কেউ হয়তো ভাইয়ের কাছে কাছে টাকা পাঠিয়েছেন, কিন্তু ভাই নিজের নামে সম্পত্তি করেছেন। অথবা স্ত্রীর নামে অর্থ পাঠিয়েছেন, তিনি হয়তো ভাই বা অন্য কারো সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে হারিয়েছেন।’

তিনি জানান, ব্যাংকের সঙ্গে তারা একটি প্রশিক্ষণ করতে গিয়ে বেশকিছু পরামর্শ পেয়েছেন এবং এখন সেগুলোই তারা প্রবাসীদেরকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।

তাহলে কীভাবে নিজেদের অর্থ সঞ্চয় করতে পারেন প্রবাসীরা— রামরু এবং ব্র্যাকের অভিবাসনবিষয়ক কর্মকর্তারা প্রবাসীদের এই ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন-

অন্তত দুটি হিসাব খুলে বিদেশে যাওয়া

তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, তারা এখন একটি ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। সেখানে বলা হচ্ছে, প্রত্যেক প্রবাসীর উচিত বিদেশে যাওয়ার আগে দুটি ব্যাংক হিসাব খুলে যাওয়া। তার একটিতে তিনি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অর্থ পাঠাবেন, আরেকটিতে থাকবে তার নিজের জমানো টাকা।

তাদের পরামর্শ হলো, এজন্য তারা ব্যাংকে নানা মেয়াদী সঞ্চয়ী স্কিম খুলে যেতে পারেন, যেখানে তাদের হিসাব থেকে সরাসরি টাকা জমা হবে।

তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমনটা অনেক সময় দেখা যায়, অনেক প্রবাসী কর্মী দেশে থাকা মামা-বাবার নামে টাকা পাঠান। অনেক ক্ষেত্রে আবার অনেক সময় স্ত্রীর কাছ থেকে অভিযোগ আসে যে, তাকে ঠিকভাবে খরচ দেয়া হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রী ও ববা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে আলাদা আলাদা হিসাব খুলে সেখানে টাকা পাঠানো যেতে পারে। তাহলে যেমন কোনো জটিলতা থাকবে না, আবার নিজের টাকার ওপরেও তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে।