ফের উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ

প্রকাশিত: ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১

ঢাকা: করোনা মহামারি শুরুর পর অনেক কিছুর মতো থমকে গিয়েছিল রাজনীতি। সেই স্থবিরতা কাটছে। নানা ইস্যুতে মাঠে নামছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। চলতি মাস ও মার্চজুড়ে বেশকিছু কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনে সম্মেলন করবে ক্ষমতাসীন দলটি। বিপরীতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার দাবিতে কর্মসূচি রয়েছে বিএনপির।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সভা-সমাবেশ, প্রতিনিধি সভা ও গণসংযোগ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কাল থেকেই সারা দেশের সাংগঠনিক ইউনিটগুলোকে এ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ দিবস, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে কর্মসূচি হাতে নিতে জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও পৌর আওয়ামী লীগকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আজ থেকে শুরু হচ্ছে স্থগিত রাখা তৃণমূলের মেয়াদোত্তীর্ণ শাখার সম্মেলনের কাজ। আরও বেশ কয়েক জায়গায় সম্মেলনের তারিখও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচির দিনগুলোতে সতর্ক থেকে পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা রয়েছে হাইকমান্ড থেকে। এসব কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে মূলত রাজপথ দখলে রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি।

দলীয় সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের কারণে স্থগিত হওয়া মুজিববর্ষের কর্মসূচিগুলো সামনের দিনে পালন করতে চায় দলটি। এছাড়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জমকালো অনুষ্ঠান উপহার দিতে চায় ক্ষমতাসীনরা। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে চলমান নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতির ওপর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগের মতোই রাজপথে দেখা যাবে নেতাকর্মীদের। পাশাপাশি সামনের দিবসভিত্তিক কর্মসূচিগুলো এবং জনসমাগমের মতো কর্মসূচিতে ফেরার কথা ভাবছে তারা।

৬ ফেব্রুয়ারি জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও পৌর আওয়ামী লীগকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। চিঠিতে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ দিবস, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে কর্মসূচি হাতে নিতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মুজিববর্ষে মহান স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালনের জন্য উপযোগী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। আলাদাভাবে এসব দিবসে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় রেখে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, প্রার্থনা, আলোচনা সভা, গ্রন্থ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, র‌্যালি, দুস্থ ও এতিমদের মাঝে খাবার-মিষ্টি বিতরণ, সাজসজ্জা-আলোকসজ্জা নানা কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সভা-সমাবেশ, প্রতিনিধি সভা ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এসব কর্মসূচি পালনে দলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সহযোগী সংগঠনগুলোকেও ঘোষিত কর্মসূচি পালনেরও আহ্বান জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে আবারও সম্মেলনের কাজ শুরু করেছি। আমি আমার বিভাগের ৬টি উপজেলার সম্মেলনের তারিখও দিয়ে দিয়েছি। এর মধ্যে ১৩ তারিখে (আজ) আছে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার সম্মেলন। ১৪ তারিখে তাড়াশ উপজেলার।

একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, আমরা এখন আবার ওয়ার্ড-ইউনিয়নগুলো গোছানোর কাজ করছি। পরিস্থিতি আর একটু ভালো হলেই আমরা সম্মেলনের কাজ শুরু করব।

দলীয় সূত্র জানায়, মূলত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে রাজপথ দখলে রাখতে চায় দলটি। এরই মধ্যে সে রকম কার্যক্রমও লক্ষ্য করা গেছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা এসব কর্মসূচিকে বিএনপির পাল্টা কর্মসূচি হিসাবে স্বীকার না করলেও তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দেশের বিরাজমান স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিনষ্টের যে কোনো অপপ্রয়াস তারা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করবেন।

বিএনপি

তিন ইস্যুতে মাঠে নামছে বিএনপি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন, সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে ফেব্রুয়ারি-মার্চজুড়ে মাঠে থাকবে দলটি। ইতোমধ্যে পাঁচ বিভাগীয় শহরে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও থাকছে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি। সমাবেশগুলোকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের শোডাউনের প্রস্তুতি চলছে। ৫ সিটির মেয়র প্রার্থীসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা গাড়িবহর নিয়ে সমাবেশে যোগ দেবেন। পথে একাধিক জায়গায় পথসভা করারও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বড় কোনো কর্মসূচি দেয়নি বিএনপি। এর মধ্যে করোনার কারণে কয়েক মাস সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিতও ছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় নতুন করে কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এর অংশ হিসাবে ৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বিভাগীয় শহরের ৬ সিটি করপোরেশনে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সমাবেশে নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ উপস্থিতি দেখতে ছেয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। এজন্য বিভাগীয় নেতাদের ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সমাবেশে ঢাকা থেকে গাড়িবহর নিয়ে যোগ দেবেন মেয়র প্রার্থীরা। পথে পথসভা করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সমাবেশ ছাড়াও নানা ইস্যুতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন রাজধানীসহ সারা দেশের মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ। দুর্নীতি, অনিয়ম, গুম-খুন এসব সরকারের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে উঠেছে। এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যারাই প্রতিবাদ করছে তাদের নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব করে তারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। গণতান্ত্রিক দল হিসাবে আমরাও নীরব থাকতে পারি না। তাই জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা তৎপর আছি এবং থাকব। দলকে সংগঠিত করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এর অংশ হিসাবে আমরা বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমাদের এ আন্দোলনকে আরও বেগবান করা হবে। আশা করি আমাদের দাবির সঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করবেন।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, দলের বিভাগীয় সমাবেশ হলে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যোগ দিতেন। যাওয়ার পথে পথসভা করতেন। এতে ওই সব অঞ্চলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হতেন। এখন খালেদা জিয়া শর্তের বেড়াজালে পড়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারছেন না। কিন্তু তৃণমূল নেতাকর্মীরা তাকে সব সময় অনুভব করছেন। তাই নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে পাঁচ বিভাগে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে ঢাকা থেকে মেয়র প্রার্থীরা গাড়িবহর নিয়ে যোগ দেবেন। অনেকটা খালেদা জিয়ার ‘রোডমার্চের’ মতোই হবে। এতে সামনের সারিতে থাকবেন সিটির মেয়র প্রার্থীরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুশৃঙ্খলভাবে হবে এসব কর্মসূচি।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি সমাবেশ হবে বরিশালে, খুলনায় ২৭ ফেব্রুয়ারি, রাজশাহীতে ১ মার্চ, ঢাকা মহানগর উত্তরে ৩ মার্চ এবং দক্ষিণে ৪ মার্চ। প্রথম সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল আজ (শনিবার) চট্টগ্রামে। কিন্তু একদিন আগে বৃহস্পতিবার রাতে এ সমাবেশ স্থগিত করা হয়। ২০ অথবা ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও চট্টগ্রামের সমাবেশ স্থগিত করা নিয়ে বিভাগীয় নেতাসহ সিটি মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিএনপি হাইকমান্ড মূলত মেয়র প্রার্থীদের সামনে রেখে সমাবেশ সফল করতে চাইছে। সে অনুযায়ীই বিভাগীয় নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্র থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদেরও সমাবেশগুলোতে যোগ দিতে বলা হয়েছে। প্রতিটি বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে থাকবেন দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। সমাবেশকে সুশৃঙ্খল করতে মঞ্চে প্রধান অতিথি, সভাপতি ও ছয় সিটি মেয়র প্রার্থীসহ অল্প কয়েকজনকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়া ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে দেশে আরও হাজারটা নির্বাচন করলেও তা সুষ্ঠু হবে না। এজন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনের বিকল্প নেই।

চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে নানা ইস্যুতে দেশব্যাপী ইতোমধ্যে তিন দফায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। ৪ মার্চ পর্যন্ত ছয়টি সমাবেশ ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে আরও কর্মসূচি দেবে বিএনপি। এরই অংশ হিসাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের মহানগর ও জেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালন করেছে।